✕
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ :- ২০২৬-১০-১৪, | ২৩:১৭:১৩ |সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে জাতীয় কৌশল বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। ঢাকায় আজ আয়োজিত এক সেমিনারের আলোচনায় তারা পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, নিরাপদ শিল্পচর্চা, দূষিত স্থান দূষণমুক্ত করা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
‘অ্যাডভান্সিং টু এ লিড-ফ্রি বাংলাদেশ: স্কেলিং সল্যুশনস, ড্রাইভিং ইয়ুথ অ্যাকশন’ শীর্ষক এই সেমিনারের আয়োজন করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং পিওর আর্থ বাংলাদেশ। সিসার বিষক্রিয়া প্রতিরোধে ১৪তম আন্তর্জাতিক সপ্তাহ উপলক্ষে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
‘শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধ,’ বৈশ্বিক এ প্রতিপাদ্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, ‘সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ২০২৬-২০৩৫ সালের জাতীয় কৌশল ও বহু বছরভিত্তিক কর্মপরিকল্পনায় নির্ধারিত অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি, সক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফল অর্জন করতে হবে। এ জন্য পরীক্ষার সুবিধা ও পরীক্ষাগার, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, দূষিত স্থান দূষণমুক্ত করা, নিরাপদ শিল্পচর্চা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। জাতীয় কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অঙ্গীকারও জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে, বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান ও দক্ষতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, প্রশিক্ষণ এবং গবেষণায় সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। পিওর আর্থের সঙ্গে বিদ্যমান সহযোগিতাসহ এ ধরনের উদ্যোগ জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।’
গত ১৭ আগস্ট মন্ত্রিসভা জাতীয় কৌশলটি অনুমোদন করে। এতে ২০৩০ সালের মধ্যে রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা রয়েছে, এমন শিশুর অনুপাত ৫০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৯৫ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালি দাস বলেন, ‘লিড-এসিড ব্যাটারি যথাযথভাবে সংগ্রহ করা, শেষ পর্যন্ত এগুলোর পরিণতি কি হচ্ছে তা জানা এবং পরিবেশসম্মত পুনর্ব্যবহার নিশ্চিত করতে সম্প্রসারিত উৎপাদক দায়বদ্ধতা (ইপিআর) সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা এগিয়ে নিতে পিওর আর্থ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ অংশীজনদের সাথে কাজ করছে।’
তিনি বলেন, ‘শিশুদের স্বাস্থ্য, সরকারি রাজস্ব ও পরিবেশের ক্ষতির বিনিময়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে সিসা পুনর্ব্যবহারের ব্যবসাকে প্রকৃত অর্থে ভলো ব্যবসা বলা যায় না। এর বৃহত্তর অর্থনৈতিক ক্ষতির চিত্র আরও উদ্বেগজনক। বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালে সিসার সংস্পর্শে আসার কারণে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল আনুমানিক ২ হাজার ৮৬০ কোটি মার্কিন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ থেকে ৯ শতাংশের সমান।’
পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মুহাম্মদ সোলায়মান হায়দার বলেন, ‘লিড-এসিড ব্যাটারি শিল্পখাতের জন্য পরিদর্শন, পরিবীক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত বিধিবিধান মেনে চলা নিশ্চিত করতে অধিদপ্তর মানসম্মত কার্যপদ্ধতি ও কারিগরি নথি তৈরি করছে। মাটিতে সিসার গ্রহণযোগ্য মাত্রা নির্ধারণের জন্য সম্প্রতি পরিবেশ অধিদপ্তরের অধীনে একটি কারিগরি কর্মীদল গঠন করা হয়েছে।’
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকি সিসার সংস্পর্শে আসার ঘটনা অনুসন্ধান এবং এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পদ্ধতিগুলো আরও জোরদার করার আহ্বান জানান। তিনি উল্লেখ করেন, এক্ষেত্রে উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার আগেই সিসার কারণে ক্ষতি হতে পারে।
মূল প্রবন্ধে পিওর আর্থ বাংলাদেশের সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার আফতাব উজ জামান খান জাতীয় কৌশল বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য সংস্থাটির নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ তুলে ধরেন।
গত সেপ্টেম্বরে পরিচালিত চূড়ান্ত পর্যায়ের পরীক্ষার প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, উদ্যোগটি বাস্তবায়নের আগে ও পরে উভয় সময়ে পরীক্ষা করা ১১১ জনের রক্তে সিসার মধ্যম মাত্রা ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালে প্রাথমিক পরীক্ষায় রক্তে সিসার মধ্যম মাত্রা ছিল প্রতি ডেসিলিটারে ৫ দশমিক ৩২ মাইক্রোগ্রাম। পরে তা কমে প্রতি ডেসিলিটারে ৪ দশমিক ৩৯ মাইক্রোগ্রামে দাঁড়ায়।
সেমিনারে সিসাদূষণ প্রতিরোধে তরুণদের নেতৃত্বে পরিচালিত উদ্যোগগুলোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ‘লোকাল অ্যাকশন ফর লিড-ফ্রি কমিউনিটিজ: ইয়ুথ-লেড সল্যুশনস’ প্রতিযোগিতায় যৌথভাবে বিজয়ী ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির শিক্ষার্থী শেখ সাজিদুল ইসলাম তার পোস্টার উপস্থাপন করেন। পোস্টারের শিরোনাম ছিল ‘সূর্য গ্যারেজ: টার্নিং ঢাকা’জ ডেড ই-রিকশা ব্যাটারিজ ইনটু আ লিড-ফ্রি সুইচ।’
এ প্রতিযোগিতা এবং ‘আর্ট ফর আ লিড-ফ্রি টুমরো’ প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা। অনুষ্ঠানে ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ অ্যালায়েন্স ফর আ লিড-ফ্রি বাংলাদেশ’ -এর যাত্রাও শুরু হয়। সিসা প্রতিরোধ, এ বিষয়ে জনমত গঠন এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে তরুণদের সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে এ মঞ্চ গড়ে তোলা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে পিওর আর্থ বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে দুটি বহনযোগ্য এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স অ্যানালাইজার হস্তান্তর করে। কঠিন পৃষ্ঠে সিসাসহ অন্যান্য ভারী ধাতুর উপস্থিতি ও মাত্রা নির্ণয় করতে পারে এসব যন্ত্র। এর মাধ্যমে দ্রুত পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়, যা পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও আইন প্রয়োগের কাজে সহায়তা করবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘সিসাদূষণ প্রতিরোধে কারিগরি সহযোগিতার একটি কাঠামো তৈরিতে পিওর আর্থের সঙ্গে সরকারের অংশীদারিত্ব সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। আজকের অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত গবেষণা, কারিগরি উদ্যোগ ও তরুণদের অংশগ্রহণ বৃহত্তর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়া উচিত। এসব উদ্যোগের শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করা হলে সেগুলোর কার্যকারিতা আরও বাড়বে।’
সেমিনারে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা, জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত, তরুণদের সংগঠন ও গণমাধ্যমের শতাধিক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।