গ্রিসে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কিম্বারলি গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলেছে হোয়াইট হাউস।
তার বিরুদ্ধে একের পর এক অসদাচরণের অভিযোগ ওঠার পর মঙ্গলবার এ সিদ্ধান্তের কথা জানায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের কার্যালয়।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে- প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ চাওয়া, রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দামি উপহার গ্রহণ এবং একটি গ্রিক নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের লবিস্টকে সরকারি বৈঠকে নিয়ে যাওয়া।
হোয়াইট হাউসের নতুন প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়া মঙ্গলবার তার প্রথম সংবাদ ব্রিফিংয়ে গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, “আমরা রাষ্ট্রদূত গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলেছি।”
জাকারিয়া আরও বলেন, “তিনি আমাদের দলের জন্য দারুণ সম্পদ ছিলেন। আমরা তার ভবিষ্যৎ জীবনের সাফল্য কামনা করি।”
এ বিষয়ে মঙ্গলবার গিলফয়েলের প্রতিনিধিরা তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করেননি। তবে তার আইনজীবীরা অর্থ চাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পাশাপাশি তার ভ্রমণসংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করে তারা জানিয়েছেন, গিলফয়েল ফেডারেল সরকারের উপহার গ্রহণ ও তা প্রকাশের নিয়ম মেনেই চলেছেন।
অর্থের বিনিময়ে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
গিলফয়েলের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হলো, সিনেটে তার রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ অনুমোদনের আগে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ চেয়েছিলেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একজন সাবেক দাতা এরিক ডিটার্স দাবি করেছেন, সিনেটে গিলফয়েলের নিয়োগ নিশ্চিত হওয়ার কয়েক দিন আগে তিনি তাকে একটি খুদে বার্তা পাঠিয়ে এক লাখ ডলার দেওয়ার অনুরোধ করেন। ওই অর্থ দিয়ে একটি আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া পরিশোধ করতে চেয়েছিলেন তিনি বলে ডিটার্সের দাবি।
ডিটার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, গিলফয়েল তাকে অর্থ দিতে রাজি করানোর জন্য বলেছিলেন, তিনি অর্থ দিলে ট্রাম্প প্রশাসনে তার ‘সুখে-দুঃখে পাশে থাকা বিশ্বস্ত সহযোগী’ হয়ে থাকবেন।
গত সপ্তাহে সিএনএনের সাংবাদিক জেক ট্যাপারকে ডিটার্স বলেন, “এটি যে বিনিময়-শর্তের সম্পর্ক ছিল, তা নিয়ে কোনও প্রশ্নই নেই।”
তবে ডিটার্স গিলফয়েলকে ওই অর্থ দেননি। তার দাবি, সে সময় তার হাতে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ বা সহজে ব্যবহারযোগ্য সম্পদ ছিল না।
গিলফয়েলের আইনজীবীরা অবশ্য এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। সিএনএনকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তারা বলেন, গিলফয়েলের হয়ে করা বক্তৃতা ও পরামর্শকাজের জন্য ডিটার্সের কাছে অর্থ পাওনা ছিল। তাদের দাবি, ডিটার্সের বক্তব্য অসত্য।
আইনজীবীরা বিবৃতিতে লেখেন, “ব্যক্তিগত জীবন থেকে সরকারি দায়িত্বে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় মিস গিলফয়েল অন্য যেকোনও পেশাজীবীর মতোই তার বকেয়া পাওনা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ইতোমধ্যে সম্পন্ন কাজের পারিশ্রমিক চাওয়া দুর্নীতি নয়; বরং এটি দুর্নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।”
অর্থ চাওয়ার ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত বা অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার তথ্য এখনও প্রকাশিত হয়নি।
দামি উপহার ও লবিস্টকে সরকারি বৈঠকে নেওয়ার অভিযোগ
গিলফয়েলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ শুধু অর্থ চাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিলাসবহুল উপহার গ্রহণ করেছেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া গ্রিসের একটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করা এক লবিস্টকে তিনি সরকারি বৈঠকে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানকে আঞ্চলিক জ্বালানি খাতের বিভিন্ন চুক্তি পেতে সহায়তা করার চেষ্টা করেছিলেন বলেও এর আগে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম গিলফয়েলের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপর থেকেই বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
গিলফয়েলের আইনজীবীরা তার ভ্রমণসংক্রান্ত প্রতিবেদনকে বিভ্রান্তিকর বলে অভিহিত করেছেন। তাদের দাবি, উপহার গ্রহণ ও তা প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি সরকারি বিধিবিধান মেনেছেন।
তবে দামি উপহার গ্রহণ এবং গ্রিক প্রতিষ্ঠানের লবিস্টকে সরকারি বৈঠকে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জানা যায়নি।
ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ গিলফয়েল
গিলফয়েলের সম্ভাব্য বিদায় ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) রাজনৈতিক আন্দোলনের একজন পরিচিত মুখের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্প পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে চার বছর বাগদানসূত্রে আবদ্ধ ছিলেন গিলফয়েল। তাদের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর তাকে গ্রিসে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত করা হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি ওই দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব গিলফয়েল ট্রাম্পের সমর্থক মহলে পরিচিত মুখ। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং হোয়াইট হাউসের পদত্যাগের নির্দেশ তাই প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সোমবার হোয়াইট হাউস ছাড়ার সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গিলফয়েলকে বরখাস্ত করার বিষয়টি বিবেচনায় রাখার কথা স্বীকার করেন।
তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি বিবেচনা করছি—হ্যাঁ। আমরা সন্তুষ্ট নই।”
এর এক দিন পরই হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে গিলফয়েলকে পদত্যাগ করতে বলার ঘোষণা আসে।
গিলফয়েলের পক্ষে কথা বলেছিলেন মার্কো রুবিও
গিলফয়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো সামনে আসার সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গ্রিস সফরে ছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে তার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ প্রকাশিত হওয়ার পরও রুবিও এ বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করতে চাননি।
তবে এথেন্স সফরের সময় একাধিক অনুষ্ঠানে গিলফয়েলের সঙ্গে অংশ নেন তিনি। একপর্যায়ে রাষ্ট্রদূত হিসেবে গিলফয়েলের প্রশংসাও করেন রুবিও।
এ জাতীয় আরো খবর..