মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ব্যাংক খাতে বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
বিশেষ করে করপোরেট ঋণ ও বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে ব্যাংকগুলো নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে। যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়া এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে এ অঞ্চলের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মুখে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিটে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর প্রধান ব্যাংকগুলো এরই মধ্যে তাদের ঋণ পোর্টফোলিও বা ঋণের খাতগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করেছে। ব্যাংক কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে করপোরেট গ্রাহকদের ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। এ ঝুঁকি মোকাবেলায় অনেক ব্যাংক তাদের সম্ভাব্য লোকসান সামলাতে বাড়তি ‘প্রভিশন’ বা আপৎকালীন সঞ্চয় রাখতে শুরু করেছে।
সিঙ্গাপুরের বৃহত্তম ব্যাংকগুলোর অন্যতম ওভারসি-চাইনিজ ব্যাংকিং করপোরেশন (ওসিবিসি) সম্প্রতি প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ব্যাংকটির নিট মুনাফা ৫ শতাংশ বাড়লেও তারা সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় ২ হাজার ১৬০ কোটি সিঙ্গাপুর ডলারের আপৎকালীন সঞ্চয় বরাদ্দ করেছে।
ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী তান তেক লং এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। বর্তমানে বড় ধরনের খেলাপি ঋণের সমস্যা না থাকলেও সতর্কতা হিসেবে আমরা বাড়তি সঞ্চয় রেখেছি।’
একই পথে হাঁটছে ইউনাইটেড ওভারসিজ ব্যাংকও (ইউওবি)। বিশেষ করে পরিবহন, কৃষি ও বিদ্যুৎ খাতের মতো ‘জ্বালানি সংবেদনশীল’ শিল্পগুলোর ওপর কড়া নজর রাখছে।
ইউওবির প্রধান নির্বাহী উই ই চিয়ং হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোও (এসএমই) ইরান যুদ্ধের কারণে দ্বিতীয় পর্যায়ের ধাক্কা অনুভব করতে পারে। জ্বালানি তেলের অস্থিতিশীল দাম ও মূল্যস্ফীতি ব্যাংকগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম ব্যাংক ‘ব্যাংক মান্দিরি’ যুদ্ধের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে একটি ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ পরিস্থিতি বা ‘ওরস্ট-কেস সিনারিও’ বিশ্লেষণ করেছে। তাদের মতে, যদি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে উঠে যায়, তবে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়ে ৩ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার ব্যাংকগুলো এখন নতুন করে বড় অংকের করপোরেট ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে।
থাইল্যান্ডের ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রেও চিত্র অনেকটা একই রকম। থাই ব্যাংকগুলো এরই মধ্যে ঋণ দেয়া কমিয়ে দিয়েছে। রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংস বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা থাইল্যান্ডের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি। থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ব্যাংকও প্রথম প্রান্তিকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আপৎকালীন সঞ্চয় রেখেছে, যা মূলত মধ্যপ্রাচ্য সংকটের সম্ভাব্য ধাক্কা সামলানোর প্রস্তুতি।
বিশ্লেষকদের মতে, করপোরেট ঋণের ক্ষেত্রে এ অস্থিরতা কেবল শুরু। ইরান যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে ব্যাংকগুলো এখন থেকে অনেক বেশি রক্ষণশীল নীতি গ্রহণ করছে। ফলে অনেক বড় শিল্পগোষ্ঠীর জন্য নতুন করে বড় অংকের ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। এটি সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধের আঁচ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্যাংকগুলো এখন থেকেই প্রতিরক্ষা কবজ তৈরি করছে। একদিকে ঋণ দেয়ার মানদণ্ড কঠোর করা হচ্ছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য মন্দা মোকাবেলায় বাড়ানো হচ্ছে নগদ অর্থের মজুদ। করপোরেট গ্রাহকদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকগুলো এখন কেবল ‘নিরাপদ’ খাতগুলোয় বিনিয়োগ সীমিত রাখার চেষ্টা করছে। এ সংকট কতদিন স্থায়ী এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে এর গভীরতা কতটুকু হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে এ অঞ্চলের ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা।
এ জাতীয় আরো খবর..