বিশ্বজুড়ে ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। গত মার্চ শেষে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩৫৩ ট্রিলিয়ন (৩৫৩ লাখ কোটি) ডলারে পৌঁছেছে, যা এ পর্যন্ত সময়ের সর্বোচ্চ রেকর্ড।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স (আইআইএফ) সাম্প্রতিক ‘গ্লোবাল ডেট মনিটর’ প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। খবর কোরিয়া হেরাল্ড।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই বৈশ্বিক ঋণ বেড়েছে ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। ২০২৫ সালের মাঝামাঝির পর এটিই সবচেয়ে দ্রুত ঋণ বাড়ার ঘটনা।
আইআইএফ বলছে, বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা এখন মার্কিন সরকারি বন্ড বা ট্রেজারি বিল থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন। এর বদলে জাপান ও ইউরোপীয় সরকারি বন্ডের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ছে।
আইআইএফের গ্লোবাল মার্কেটস অ্যান্ড পলিসি পরিচালক এমরে টিফটিক জানান, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা এখন বিনিয়োগ বহুমুখী করার চেষ্টা করছেন। তারা মার্কিন ট্রেজারি থেকে দূরে সরছেন। যদিও ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের মার্কিন বন্ড বাজারে এখনই কোনো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নেই, তবে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে যুক্তরাষ্ট্রের এ ঋণ ব্যবস্থা এখন একটি ‘অস্থিতিশীল’ পথে রয়েছে।
বিপরীতে, ইউরোজোন ও জাপানের ঋণের অনুপাত আগের তুলনায় কিছুটা কমতে শুরু করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক ঋণ বাড়ার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। আমেরিকায় ঋণের এ উল্লম্ফন মূলত সরকারের ঋণগ্রহণের কারণে ঘটছে। বর্তমানে দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ জিডিপির তুলনায় যে হারে বাড়ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট (এআই) খাতের হাত ধরে মার্কিন করপোরেট বন্ড বাজার এখনো বেশ চাঙ্গা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে চীনে ঋণের চিত্রটি ভিন্ন। দেশটিতে আর্থিক খাতের বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ নেয়ার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। বছরের শুরুতে চীনের বড় করপোরেট কোম্পানিগুলো ব্যাপক হারে ঋণ নেয়ায় দেশটির সামগ্রিক ঋণের বোঝা আরো ভারী হয়েছে।
উন্নত দেশগুলোয় ঋণের অনুপাত কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও চীন বাদে অন্য উদীয়মান বাজারগুলোয় ঋণের পরিমাণ রেকর্ড ৩৬ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। প্রধানত সরকারি ঋণের কারণেই এসব দেশের দায়ভার বাড়ছে বলে জানিয়েছে আইআইএফ।
বিশ্ব অর্থনীতির মোট উৎপাদনের তুলনায় ঋণের অনুপাত এখন ৩০৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আইআইএফের তথ্যমতে, গত এক বছরে ঋণের অনুপাত সবচেয়ে বেশি বেড়েছে নরওয়ে, কুয়েত, চীন, বাহরাইন ও সৌদি আরবে। এসব দেশ জিডিপির তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশের বেশি নতুন ঋণ যোগ করেছে।
আইআইএফ সতর্ক করছে, সামনের দিনগুলোয় বেশকিছু কাঠামোগত কারণে ঋণের পরিমাণ আরো বাড়বে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও বার্ধক্য, প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানিনিরাপত্তা ও সাইবার নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো সরকারি ও করপোরেট উভয় খাতের ঋণের চাপ বাড়িয়ে দেবে। এছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের বিপুল বিনিয়োগের জন্যও বড় অংকের মূলধনি ব্যয়ের প্রয়োজন হবে।
এর মধ্যে নতুন করে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ। চলমান অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ঋণের বোঝা তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, গত বছর বিশ্বজুড়ে মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ ছিল জিডিপির প্রায় ৯৪ শতাংশ। তবে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বজায় থাকলে ২০২৯ সালের মধ্যে এ ঋণের পরিমাণ ১০০ শতাংশে পৌঁছতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের ফলে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এবং আর্থিক পরিস্থিতি সংকীর্ণ হয়ে আসছে। যুদ্ধ থামলেও এর প্রভাব কাটতে লেগে যাবে অনেকটা সময়।
আইএমএফের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার এক কঠিন উভয় সংকটের সম্মুখীন। একদিকে ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং ঋণের বোঝা নিয়ন্ত্রণ করা।
এমরে টিফটিকও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সংঘাত এ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে। যুদ্ধের কারণে প্রতিরক্ষা ও জ্বালানির পেছনে দেশগুলোকে আরো বেশি অর্থ খরচ করতে হবে, যা বিশ্বকে এক দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে যুদ্ধের উত্তেজনা আর অন্যদিকে প্রযুক্তির পেছনে বিশাল ব্যয়, সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন ঋণের সাগরে ডুবে আছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের আস্থা কিছুটা কমে আসা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক নতুন সতর্কবার্তা।
উল্লেখ্য, বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ এক বছরে রেকর্ড প্রায় ২৯ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়ে মোট ৩৪৮ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে। করোনা মহামারীর পর এক বছরে ঋণের এমন বিশাল উল্লম্ফন আর দেখা যায়নি।
এ জাতীয় আরো খবর..