বিশ্বজুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে থাকা অন্যতম একটি বিষয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই।
প্রযুক্তিটির দৌড়ে পিছিয়ে থাকতে চায় না বিশ্বের টেক জায়ান্টগুলো। কিন্তু প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে কোম্পানিগুলোর খরচ এখন আকাশচুম্বী। খাতটিতে বিপুল বিনিয়োগ করছে অ্যামাজন, অ্যালফাবেট (গুগল), মাইক্রোসফট ও মেটার মতো জায়ান্ট কোম্পানিগুলো। ফলে গত ১০ বছরে এসব প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ বা ‘ফ্রি ক্যাশ ফ্লো’ কমে এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে অবস্থান করছে। ব্রিটিশ দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, চার কোম্পানি মিলে এখন পর্যন্ত প্রায় ৭২৫ বিলিয়ন বা ৭২ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এত বিপুল ব্যয়ের কারণে বড় কোম্পানিগুলোর আর্থিক কাঠামোয় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর জন্য ফ্রি ক্যাশ ফ্লো বা মুক্ত নগদ প্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ব্যবসা পরিচালনার খরচ এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পর হাতে যে অর্থ থাকে, তাকেই বলা হয় ফ্রি ক্যাশ ফ্লো। এ অর্থ দিয়েই কোম্পানিগুলো শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেয় কিংবা ঋণের কিস্তি শোধ করে।
ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-আগস্ট) অ্যামাজন, অ্যালফাবেট, মাইক্রোসফট ও মেটার মতো চার ‘হাইপারস্কেলার’ কোম্পানির সম্মিলিত ফ্রি ক্যাশ ফ্লো ৪০০ কোটি ডলারে নেমে আসতে পারে। অথচ করোনা মহামারীর পর গত ছয় বছরে কোম্পানিগুলোর প্রতি প্রান্তিকে ফ্রি ক্যাশ ফ্লো ছিল গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। এমনকি ২০১৪ সালের পর থেকে চার কোম্পানির ফ্রি ক্যাশ ফ্লো কখনই এত নিচে নামেনি। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে কোম্পানিগুলোর আয় এখনকার তুলনায় ছিল প্রায় সাত ভাগের এক ভাগ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একসময় এসব কোম্পানিকে ‘অ্যাসেট লাইট’ বা কম সম্পদের কোম্পানি বলা হতো। কারণ এদের খুব বেশি অবকাঠামো প্রয়োজন হতো না। কিন্তু এখন বিশ্বের অন্যতম বড় অবকাঠামো বিনিয়োগকারীতে পরিণত হয়েছে গুগল, অ্যামাজন, মেটা ও মাইক্রোসফট।
ব্যাংক অব আমেরিকার ইন্টারনেট বিশ্লেষক জাস্টিন পোস্টের মতে, প্রযুক্তি শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগের সময় এখন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে পিছিয়ে পড়ার ভয়ে কোম্পানিগুলো বিশাল ঝুঁকি নিচ্ছে।
তার মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ‘প্রিজনারস ডিলেমা’ বা এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে এক কোম্পানি বিনিয়োগ করলে অন্য কোম্পানিও বিনিয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিনিয়োগের এ ধাক্কা প্রতিটি বড় কোম্পানির ওপর ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলছে বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। চলতি বছর অ্যামাজন আয়ের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অ্যামাজন একাই ২০২৬ সালে ২০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে, যা অন্য যেকোনো কোম্পানির চেয়ে বেশি। অন্যদিকে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জানুয়ারি-জুন) মেটার হাতে থাকা নগদ অর্থ কমতে শুরু করবে, এছাড়া অন্তত একটি প্রান্তিকে মাইক্রোসফটের নগদপ্রবাহ নেতিবাচক হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অ্যালফাবেটের নগদ প্রবাহ ইতিবাচক থাকলেও তা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন হতে পারে।
প্রতিবেদন বলছে, এত দিন বড় বড় সব কোম্পানি নিজস্ব আয় থেকেই বিনিয়োগ করছিল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলেছে। এআই যুদ্ধের খরচ জোগাতে এখন অন্য কৌশলের দিকে ঝুঁকছে তারা। যেমন কর্মী ছাঁটাই করা, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ কমিয়ে দেয়া কিংবা চড়া সুদে বাজার থেকে ঋণ নেয়া।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর এ বিপুল অর্থ বিনিয়োগের প্রকৃত ঝুঁকি ও আর্থিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্লেষকদের মধ্যে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিপুল খরচ সরাসরি নিজেদের মূল হিসাবপত্রে দেখাচ্ছে না। বরং আলাদা প্রতিষ্ঠান বা বিশেষ প্রকল্প কোম্পানির মাধ্যমে সে ব্যয় দেখানো হচ্ছে। এতে কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো দেখালেও প্রকৃত ঝুঁকি আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে যদি এআই-ভিত্তিক ডেটা সেন্টারের চাহিদা কমে যায়, তাহলে এসব প্রকল্পে নেয়া বিশাল ঋণের দায় শেষ পর্যন্ত কে বহন করবে, তা স্পষ্ট নয়।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান লিউজ বলেন, ‘অনেক কোম্পানি যেভাবে হিসাব উপস্থাপন করছে, বাস্তবে তাদের নগদ অর্থের পরিস্থিতি হয়তো আরো দুর্বল।’
এদিকে ডেটা সেন্টার নির্মাণের খরচও দ্রুত বাড়ছে। মেমোরি চিপ, চিপসেটসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি উপকরণের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ফলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।’
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা সার বা রাসায়নিক শিল্পের মতো। এসব খাতে শুরুতে বিপুল বিনিয়োগ হয়। পরে উৎপাদন বেড়ে গেলে প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং লাভের পরিমাণ কমে যায়।
তবে আশাবাদও রয়েছে। ২০২৬ সাল নাগাদ এআই খাতে বর্তমান বিনিয়োগ থেকে বড় ধরনের আয় আসতে শুরু করতে পারে বলে ধারণা খাতসংশ্লিষ্টদের।
সব মিলিয়ে, লাভ-লোকসানের হিসাবের চেয়ে এআই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকাকেই এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।
এ জাতীয় আরো খবর..