প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল জলরাশি। তার বুকে বিন্দুর মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু দ্বীপ।
এসব দ্বীপই বিশ্বের মোট টুনা মাছের অর্ধেকের বেশি জোগান দেয়। এ দ্বীপপুঞ্জের ঠিক মাঝখানে ৩৩টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি ছোট দেশ, নাম কিরিবাতি। আয়তনে নিউইয়র্ক শহরের সমান দেশটিতে স্থলের চেয়ে জলই বেশি। কিন্তু আজ জলবায়ু পরিবর্তনের এক অদৃশ্য থাবা দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড টুনা শিল্পকে ধসিয়ে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। খবর বিবিসি।
কিরিবাতির স্থলভাগ খুব ছোট হলেও এর সমুদ্রসীমা বা এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন (ইইজেড) বিশাল। প্রায় ৩৪ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এ সমুদ্রসীমা ভারতের চেয়েও বড়। গিলবার্ট, ফিনিক্স ও লাইন এ তিন দ্বীপপুঞ্জকে ঘিরে থাকা বিশাল নীল জলরাশি টুনা মাছের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। এখানে স্কিপজ্যাক, ইয়োলোফিন ও বিগআই টুনার মতো দামি মাছ পাওয়া যায়।
কিরিবাতির অর্থনীতি পুরোপুরি এ মাছের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির সরকারি আয়ের ৭০ শতাংশের বেশি আসে বিদেশী জাহাজকে টুনা মাছ ধরার লাইসেন্স দেয়ার মাধ্যমে। বিশ্বের আর কোনো দেশে মাছের ওপর এমন নির্ভরতা দেখা যায় না। উল্লেখ্য, বিশ্বব্যাপী টুনা মাছের বাজার মূল্য ৪ হাজার ৪০০ কোটি ডলার।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৪ সালে মাছ ধরার লাইসেন্স বিক্রি করে কিরিবাতি ১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় করেছে।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বাড়ছে। এ সামান্য তাপমাত্রা বৃদ্ধিতেই টুনা মাছ নিজেদের বিচরণক্ষেত্র বদলে ফেলছে।
বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, টুনা মাছগুলো চিরতরে কিরিবাতির সমুদ্রসীমা ছেড়ে পূর্ব দিকে শীতল পানির সন্ধানে চলে যেতে পারে। মাছ চলে গেলে বিদেশী জাহাজগুলো আর কিরিবাতির লাইসেন্স কিনবে না।
দেশটির মৎস্য মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব রিবিতা আবেতা এ পরিস্থিতিকে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। কারণ ২০১৮-২২ সালের মধ্যে সরকারি বাজেটের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই এসেছিল এ লাইসেন্স থেকে। এটি কিরিবাতির মোট জিডিপির প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ।
মৎস্য বিশেষজ্ঞ সাইমন ডিফি বলেন, ‘কিরিবাতির সর্বোচ্চ স্থান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র দুই মিটার উঁচু। সেখানে টুনা মাছ ছাড়া আর কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। ফলে টুনা মাছ হারিয়ে গেলে দেশটির সামনে বিকল্প কোনো পথ খোলা থাকবে না।’
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কিরিবাতি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি হবে। যদি গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ বর্তমানের মতো উচ্চ হারে চলতে থাকে, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশটি বছরে ১ কোটি ডলারের বেশি রাজস্ব হারাতে পারে।
এছাড়া খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়ছে। কিরিবাতির মানুষের প্রধান খাবার হলো মাছ। সেখানকার একজন মানুষ বছরে গড়ে ১০০ কেজি মাছ খায়, যা জাপানিদের (২২ কেজি) বা আমেরিকানদের (নয় কেজি) তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু সাগরে মাছ কমে যাওয়ায় স্থানীয় মানুষের খাদ্য তালিকায় এরই মধ্যে টান পড়ছে। মানুষ বাধ্য হয়ে আমদানীকৃত খাবারের ওপর নির্ভর করছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) সতর্ক করেছে, এ পরিবর্তনের ফলে দ্বীপরাষ্ট্রটির মানুষের খাদ্য খরচ বাড়ছে এবং পুষ্টির মান কমছে।
তবে এ ভয়াবহ সংকট মোকাবেলায় হাত গুটিয়ে বসে নেই কিরিবাতি। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের সহায়তায় ১৫ কোটি ৬৮ লাখ ডলারের এক বিশাল প্রকল্প শুরু হয়েছে সেখানে। এ প্রকল্পের লক্ষ্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করা।
জলবায়ু পরিবর্তনের এ ঝুঁকির মধ্যে টিকে থাকতে কিরিবাতি নতুন কৌশল নিচ্ছে। টুনা মাছের ওপর অতিনির্ভরশীল দ্বীপরাষ্ট্রটি এখন আয় ও খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশটিতে গড়ে তোলা হচ্ছে একটি শক্তিশালী সতর্ক ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে আগেভাগেই টুনা মাছের গতিবিধি শনাক্ত করা যাবে। এতে মাছ ধরার পরিকল্পনা আরো কার্যকর হবে এবং আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এরই মধ্যে টুনা প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ক্যানিং কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যা থেকে বাড়তি মূল্য সংযোজন (ভ্যালু অ্যাডিশন) ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, কিরিবাতির বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ববাসীর জন্য একটি সতর্কবার্তা। একটি দেশ কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে টিকে থাকার লড়াইয়ে নামতে বাধ্য হয়, তার বাস্তব উদাহরণ এ দ্বীপরাষ্ট্র। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপটির মানুষ এখন তাকিয়ে আছে বড় অর্থনীতির দেশগুলোর দিকে। গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক উদ্যোগ জোরদার না হলে তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এ জাতীয় আরো খবর..