“স্বাধীনতার গল্প গড়ি”

সেদিন স্টলে এক ক্রেতা আসলেন, ভদ্রমহিলার অনেক কিছুই পছন্দ হচ্ছিলো, এটা সেটা ধরে বার বার ধরে দেখছিলেন, দেখে আমার ভালো লাগছিলো। যাক, আমাদের কাজ কারো এতো পছন্দ হচ্ছে!

কিন্তু অনেক কিছু ধরেও কিনতে পারলেন না টাকার স্বল্পতার জন্য। পরে বললেন তার সাহেবকে নিয়ে আসবেন। সাহেবকে নিয়ে এসে পছন্দের জিনিসটা বার বার দেখালেও কিনতে পারেননি বরং বিরক্তির কারণ হচ্ছিলেন স্বামীর। না পাওয়ার অপ্রাপ্তি নিয়ে তাকে ঘরে ফিরতে হয়েছে কারণ কেনার অর্থের জন্য নির্ভর করতে হয় স্বামীর উপর।

শুধু একটি নয়, হাজারো নারীর গল্পটাই এমন। অন্যের টাকা খরচের জন্য যে দিতে হয় নানান ধরনের কৈফিয়ত। নিজের সবকিছুর উপর যেমন আমরা অধিকার খাটাতে পারি তা অন্যেরটা দিয়ে কখনোই হয়না- হোক না সেই অর্থ বাবা, স্বামী বা ছেলের।

হাজার নারী ঘুমিয়ে যায় অনেক অপ্রাপ্তি নিয়ে, পরাধীনতার শিকলে আঁটকে থেকে আবার এদের সকাল হয় অন্যের কাছে সাহায্য নিয়ে নিজ চাহিদা পূরণ করতে। স্বাধীন দেশে বসবাস করে আমাদের মা বোনেরা পরাধীনভাবে বেঁচে থাকে এতে দারুণ দুঃখ হয় আমার।

অনেকের সঙ্গী বেশ ভালো, হয়তো স্ত্রীর চাহিদা খুশি মনেই সব পূরণ করেন, অনেক ভাই পূরণ করেন বোনের আবদার। তবে এই ঘটনাও কম নয় যে পুরুষদের খোটাও শুনতে হয় অনেক নারীর তাদের চাহিদা পূরণের জন্য।

অনেকের কাছে নারীর মূল্য রান্না করে খাওয়ানোর জন্য,কারো কাছে বাচ্চার মা এই জন্য, আবার শুধুমাত্র জৈবিক চাহিদা পূরণের জন্য, কারো আবার অবলা বলে মায়া দেখানোর জন্য। এর থেকে ঢের শ্রেয় নারীর মূল্য হোক ব্যক্তিসত্তার জন্য,অনুপ্রেরণা যোগানোর জন্য, দুঃসময়ে পরিবারকে শক্ত করে ধরে রাখার জন্য, কারো বোঝা না হয়ে বেঁচে থাকার জন্য।

ঘরের কাজকে কখনোই ছোট করে দেখিনা এর জন্য আমি গৃহিণী মায়েদের ‘হাউজ ওয়াইফ’ না বলে ‘হোম মেকার’ বলে শ্রদ্ধার সাথে সম্মোধন করি। তবে আমার আশা এটুকুই- নারীরা যে যেভাবেই পারুক স্বাবলম্বী হোক, হোক না সেই সূচনা ছোট কিছু দিয়ে তারপরও হোক। কেননা সৎ উপায়ে উপার্জন সকল কাজই হয় সম্মানের।

যুগ এতো এগিয়ে যাচ্ছে, তবে নারীরা এগিয়ে যাবে না কেনো! সন্তান দেখতে হয়, ঘরে থাকতে হবে, শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে সার্টিফিকেট কম কোন সমস্যা নেই। এই আধুনিক যুগে আমাদের ইনকামের হাজারো উৎস আছে,ঘরে বসে উপার্জন করা এখন আর দিবাস্বপ্ন নয়। জীবন খুব সহজ হয়ে যাচ্ছে, সাথে জীবিকার পথ বেরুচ্ছে।

আলসেমি, ব্যার্থতা, ভয়, পরশ্রীকাতরতা এসব অপছন্দ করে সফল হবার জন্য উন্মাদনা আর জেদ থাকতে। পরিশ্রমকে পছন্দ করতে হবে।

আমাদের সৃষ্টির সাথে সাথে সৃষ্টিকর্তা বিশেষ কিছু প্রতিভা দিয়ে পাঠিয়েছেন। এমন কোন সৃষ্টি-ই নেই যার বিশেষত্ব নেই। সেই বিশেষ প্রতিভাগুলো খুঁজে বের করুন, বিকাশ ঘটান, প্রতিকূলতাকে সুযোগ হিসেবে ধরে নিয়ে এগিয়ে যান।

মাঝেমধ্যে ক্যাশ কাউন্টারে প্রিয়তমকে সড়িয়ে প্রিয়তমার ক্যাশ পেমেন্ট করাটা আত্নতৃপ্তি এনে দেয়। বাচ্চার জন্মদিনে মায়ের দেয়া ছোট উপহারটাও সবচেয়ে দামী হয়ে যায়। বাবাকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জের সময় ভাইয়ের সাথে অল্প পরিমাণে টাকা শেয়ারিংও অনেক স্বস্তি বয়ে বেড়ায়। বিল দিতে গিয়ে ছেলে কলিগটির দিকে না তাকিয়ে কার্ড বাড়িয়ে দেয়াটা হতে পারে সমতার প্রতীক।

অধিকার, চাকুরী, টাকার ক্ষেত্রে ন্যায্যতা ও সমতা বলে চিৎকার না করে পুরুষের সাথে সমান তালে কাজ করতে হবে। কাজেই বাড়ে ন্যায্যতা, সহযোগিতায় আসে সমতা।

সহযোগিতা আর সৎকর্ম সব সময় হয় শ্রদ্ধার, আনন্দের, শান্তির। আবার কখনো হয় স্বাধীনতার পতাকা। মানুষের জন্য স্বাধীনভাবে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো একটি আশীর্বাদ বিশেষ

আসুন না আমরা অন্যের কাছে পরাধীন না থেকে স্বাধীন হয়ে ফানুশ উড়াই। যে যার সাধ্যমতো পরিশ্রম করে স্বাধীনতার গল্প ছড়াই।


নাজমুন নাহার চৈতী
প্রভাষক
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

You might also like

Leave A Reply

Your email address will not be published.